রহস্যময় মায়ান সভ্যতা

ইতিহাসে মায়াসভ্যতা মিশে আছে হাজারো রহস্যময় গল্প নিয়ে। জ্যোতির্বিদ্যা এবং নির্ভুল ভবিষ্যতবাণী করে যারা যুগে যুগে লোকমুখে এসেছেন, সেই মায়া সভ্যতাজুড়ে ছিল মায়া সাম্রাজ্য। মায়া সভ্যতায় রয়েছে হাজারো রহস্য যা আমাদের অজানা। অজানা সেই মায়া সভ্যতার রহস্য সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক……

মায়া সভ্যতা:

মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো , গুয়াতেমালা,হন্ডুরাস, বেলিজ, এবং এল সালভাদর এই ৫ দেশে প্রায় তিন সহস্রাব্দী্রও বেশী সময় জুড়ে গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা। এই এলাকায় শিকারী যাযাবর মানুষদের বসবাসের সাক্ষ্য পাওয়া যায় ১১,০০০ বছর আগে থেকে। মায়া সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন মেলে ২৬০০ খৃস্টপুর্বাব্দে মেক্সিকোর ইয়াকাটুন উপদ্বীপে। প্রায় একই সময়ে বেলিজের কুয়েলোতে (Cuello, Belize ) মায়া বসতি গড়ে উঠেছিল । তৃতীয় খৃস্টাব্দ এ প্রায় নিরবিচ্ছিন্ন ৩ লক্ষ ১১হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তন ছিল মায়া এলাকার । পুরোনো ওলমেক এবং এজটেক সভ্যতার উপর গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা।

জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্যশিল্প,অঙ্ক শাস্ত্র, চিত্রলিপির ব্যবহার, ক্যালেন্ডার বা দিনপঞ্জীর ব্যাবহার প্রভৃতিতে মায়ারা বিশেষ অবদান রেখেছিল। জঙ্গল পরিস্কার করে চাষাবাস, রাস্তাঘাট তৈরী, জলাধার নির্মান, বুনন , মৃত্তিকা শিল্প প্রভৃতিতেও মায়ারা ছিল সমান দক্ষ।
মায়াদের এলাকা- কে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ১)উত্তর পশ্চিম হন্দুরাস,
২)গুয়াতেমালার পেতেন অঞ্চল ,
৩)বেলিজ এবং চিয়াপাস অঞ্চলের গ্রীস্ম মন্ডলীয় বনভুমি ছিল মায়া সভ্যতার প্রান কেন্দ্র।

মায়া সভ্যতার সময়কালঃ

অনান্য সভ্যতার মত মায়াদের ইতিহাসেও ছিল উত্থান, পতন। মায়া সভ্যতার সময়কালকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। খৃস্টপূর্ব ১৮০০ শতাব্দী থেকে প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে গোড়াপত্তন হয় মায়া সভ্যতার। এই সময়ে মায়াদের তৈরী মাটির পাত্র এবং পোড়ামাটির সামগ্রীর সন্ধান পাওয়া যায়। ২৫০ খৃস্ট পূর্বাব্দের মায়া ভাষার প্রথম চিত্রলিপি বা Heiroglyphics এর সন্ধান পাওয়া যায় এই এলাকায়। প্রিক্লাসিক পিরিয়ড টিকে থাকে ১০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। ৩য় খৃস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত মায়াসভ্যতার কালকে বলা হয়ে থাকে ক্লাসিক পিরিয়ড এই সময়কে বলা হয়ে থাকে মায়া সভ্যতার স্বর্নযুগ। এর পরের সময় হল পোস্ট ক্লাসিক পিরিয়ড।

মায়াদের ধর্ম:

মায়ারা বিশ্বাস করত যুগে যুগে সৃস্টি এবং ধ্বংসের। মায়াদের এক যুগ হল ৫,২০০ বছর নিয়ে। বর্তমান যুগ শুরু হয়েছিল ৩১১৪/৩১১৩ বছর আগে এবং ২০১১/১২ সালে তা শেষ হবে। মায়া সৃস্টিতত্ব অনুযায়ী পৃথিবী সমতল, চতুস্কোন এবং চার কোনাকে ধরে রেখেছেন ৪ জন দেবতা। সমতল পৃথিবী হল শাপলার দিঘীতে ভেসে থাকা বিশাল আকৃতির কুমীরের পিঠ। পৃথিবীর প্রত্যেক কোনার আবার রঙ আছে যেমন পূর্বকোনা লাল রঙের, পশ্চিমকোন কালো, উত্তর কোন সাদা, এবং দক্ষিন কোন হলুদ, আর কেন্দ্রের রঙ হল সবুজ। আকাশ হল পৃথিবীর প্রতিফলনএবং তা পৃথিবীর কুমিরের মতই দুই মাথা ওয়ালা সাপ এর অংশবিশেষ। আকাশে্রও বিভিন্ন স্তর ছিল , আকাশের চার কোনায় চারজন অমিত শক্তিশালী “বাকাব” দেবতা উচু করে ধরে রাখতেন আকাশকে।
স্বর্গ ছিল ১৩ স্তরবিশিস্ট, আর প্রত্যেক স্তরেই থাকতেন একজন দেবতা। নরক ছিল ৯ স্তরের।

মায়ানদের দৈনন্দিন জীবনযাপন :

একজন মায়া সম্রাট এবং অভিজাতদের জীবন অত্যন্ত সহজ ও বিলাবহুল ছিল।
স্নান করাটা ছিল তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। স্নান না করলে তারা খুবই অসুবিধা বোধ করত। অবশ্য স্নান সব মায়ারাই করত। এটা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ বলে মনে করা হতো।

যারা ধনী ও অভিজাত মায়া ছিল তারা সাধারণত জন্তু জানোয়ারের চর্ম ও লোম হতে তৈরি বস্ত্র পরিধান করত। যা দেখতে যেমন রঙিন হত তেমনই ভারী হত। তারা মহামূল্যবান রত্ন ও সোনা দ্বারা সৃষ্ট গয়না পড়তে পছন্দ করত।
সাধারণ মায়ারা নেংটি পড়ে থাকত। গ্রীষ্মকালে খালি গায়ে থাকলেও শীতকালে পুরুষরা ঊর্ধ্বাঙ্গে পঞ্চো ধরণের পোশাক পড়ে থাকত। যা কম্বল দিয়ে তৈরি করা হত।

তবে মেয়েরা লম্বা স্কার্ট গোছের পোশাক পড়ত। এদের উভয় লিঙ্গের পোশাকআশাক অনেকাংশে অ্যাজটেক সভ্যতার মতন ছিল। আরও দুটি বিষয়ে উভয় লিঙ্গের মধ্যে মিল ছিল। আর তা হল উভয়েই বিয়ের পরে গায়ে উল্কি মেরে রাখত নিজেদের বিবাহিত প্রমাণ রাখতে। এবং উভয়েই একই রকমের বিশাল কেশরাজি বহন করে রাখত।

খাদ্য:

মায়াদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আহার ছিল ভুট্টা বা মেইজে। তারা এই ভুট্টা দিয়ে সব রকমের খাদ্য তৈরি করে খেত। যেমন টর্টিলা, ডালিয়া এবং পনীর জাতীয় খাদ্য। এমনকি ভুট্টা পচিয়ে মদ তৈরি করে খেত। এছাড়া এরা আহার হিসাবে যেসব খাদ্যশস্য ও আমিষ গ্রহণ করত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিম, সব রকমের শুঁটি, স্কোয়াশ, লঙ্কা। এছাড়া হরিণ, হাঁস, বক, টার্কি এবং মাছ। মাছ তারা বেশী করে খেত বিশেষ করে সমুদ্রের মাছ। তেলাপিয়া ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য।

বাড়িঘর:

অভিজাত ও সম্রাট এর আত্মীয় বর্গের দল শহরের মধ্যে নিখাদ গ্রানাইট পাথরের বাড়িতে বসবাস করতেন। তাতে বাগান বাড়ি ও বিরাট স্নানাগার থাকত। আর মায়া জনসাধারণ গ্রামে কৃষিক্ষেতের পাশে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকত। এইসব কুঁড়েঘর তৈরি হত এঁটেল মাটি দিয়ে। এসব বাসস্থান অত্যান্ত নিম্নমানের ছিল। এইসব বাড়িতে ঘরের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। এক, প্রার্থনা ঘর এবং রান্না ঘর এবং দুই শয়নকক্ষ এবং শৌচাগার। এইসব বাড়ির ছাদ পাম গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া থাকত।

তবে কিছু কিছু মায়া সাধারণ মানুষ পাথরের বাড়িতে বসবাসও করত; তবে তাদের সংখ্যা ছিল অল্প। তবে সব মায়ারাই মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে পাথর দিয়ে মাচা বানিয়ে তার উপরে বাড়ি বানাত। এতে বন্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। কেননা অধিকাংশ মায়া নগররাষ্ট্র এবং সংলগ্ন অঞ্চল ছিল সমুদ্রতীরে। সেই জন্যই এমন সতর্কতা পালন করত। বিশেষতঃ ইউকাটায়েন উপদ্বীপ অঞ্চলে সর্বদাই সুনামি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রায়ই আসত। সেই জন্যই এমন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল মায়া অঞ্চলে।

জ্যোতির্বিদ্যা:

তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘর একটি ঝাপসা দাগসহ উত্তপ্ত আগুনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যা ওরিয়ন নীহারিকার অনুরুপ। এইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ধারণা সমর্থন করে যা দূরবীক্ষণ আবিস্কারের পূর্বে মায়ারা আকাশের তারকার একটি পরিব্যাপ্ত অঞ্চল পিন-পয়েন্টতে সনাক্ত করেছিল।

মায়ারা জেনিয়াল প্রস্থান গুলোতে খুব কৌতূহলী ছিল, যখন সূর্য সরাসরিভাবে মাথার উপর দিয়ে যায়। তাদের নগরীর বেশির ভাগ অক্ষাংশ কর্কটক্রান্তির নিচে হওয়ায, এই প্রকৃত প্রস্থান গুলো নিরহ্মরেখার উপর থেকে সমান দূরত্ব এক বছরে দুইবার ঘটাবে। সূর্য মাথার উপরের এই অবস্থানটি প্রতিনিধিত্ব করতে, মায়ার একটি দেবতা ছিল যার নাম দেবতা ডাভিইং।

কোডেক্স :

মায়ান জাতি নিজেদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য কোনো বর্ণ বা অক্ষর ব্যবহার করত না। মূলত তারা চিত্রকর্মের মাধ্যমে মনের ভাব ফুটিয়ে তুলত। এরকম প্রায় ৮০০ এর ও বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে। চিত্রকর্মগুলো তারা ফুটিয়ে তুলত “কোডেক্স”এ। কোডেক্স হচ্ছে গাছের ছাল-বাকল দিয়ে তৈরি এক ধরনের কাগজ। এসব কোডেক্সের মধ্যে বিখ্যাত কিছু জীবিত কোডেক্স হলো প্যারিস কোডেক্স, মাড্রিড কোডেক্স এবং ড্রেসডেন কোডেক্স। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “ড্রেসডেন কোডেক্স” নামক ৩৯ পাতার বইটি। এই কোডেক্সটি এটি বর্তমানে জার্মানের স্যাক্সন স্টেট লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। এ পর্যন্ত ৪ টি কোডেক্স অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর দিকে মায়া সভ্যতার আরেকটি কোডেক্স উদ্ধার করতে সক্ষম হয় জোসু সায়েঞ্জ। এটি “গ্রোলিয়ার কোডেক্স” নামে পরিচিত। এই কোডেক্সটি ডুমোর গাছের ছাল দিয়ে তৈরি। দশ পাতার এই কোডেক্সটি থেকে মায়াদের নানা আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এমনকি এই কোডেক্সটি থেকে মায়ান দেবতাদের সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানা যায়। ধারণা করা হয় এটি ১৩শ শতকের মাঝামাঝি সময়কার নথিপত্র।

গণিত:

তারা খুব নির্ভূল ভাবে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ করেছিল, তাদের নকশায় চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহগুলোর পর্যায়কাল সমান অথবা অন্যান্য সভ্যতার খালি চোখে পর্যবেক্ষকগণদের থেকে উন্নত ছিল।
মেক্সিকানের অন্যান্য সভ্যতা গুলোর সাথে মায়া সভ্যতার আরও মিল হলো, মায়া সঠিক এবং নির্ভুলতার সাথে সৌর বছরের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেছিল। ইউরোপীয়নরা যে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করতো তার চেয়েও অনেক বেশি সঠিক এবং নির্ভুল ছিল।

তারা যে অপরিণত বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার করেছিল, এটি ভিত্তি করা হয়েছে এক বছর যথাযথভাবে ৩৬৫ দিন, এর অর্থ এই যে বর্ষপঞ্জিকা প্রতি চার বছরে এক দিন বৃদ্ধি পায়। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিকা ব্যবহার হতো ইউরোপে রোমানদের সময় থেকে ১৬ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত। প্রতি ১২৮ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হয়েছিল। আধুনিক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা আরও বেশি নির্ভূল, প্রায় ৩২৫৭ বছরে কেবল এক দিনের ত্রুটি জড়িত হচ্ছে।

বর্ষপঞ্জিকা :

তাদের একটি গৌণ বর্ষপঞ্জিকার উপরে চেইন দিয়ে বেধে দেওয়া হয়েছিল, যেটি ধর্মীয় প্রথা উদ্দ্যেশ্যের জন্য ব্যবহার করা হতো এবং দেবতদের জন্য ২৬০ দিনের একত্র করে একে গঠন করেছিল, ২০ দিনের ১ “মাস” আর ১৩ মাসে ১ বছর এবং ৫২ বছর ১ শতাব্দী ছিল। এক K’atun ২০ বছর, ৩৬০ দিনের একটি চক্র যা পুনরাবৃত্তি হতো তাৎপর্য্য ব্যতীত।

মায়াদের দেবতা ও পুরাণ:

পাথুরে এবং পোড়ামাটির পুঁথি হতে তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধে প্রচুর তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এইসব মায়ান পুঁথিকে বলা হয় কোডেক্স। এর মধ্যে বিখ্যাততম জীবিত মায়া কোডেক্স হল প্যারিস কোডেক্স সম্ভবতঃ ১৫৫৪ থেকে ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দে এই মহামূল্যবান কোডেক্স তৈরি করা হয়েছিল জাগুয়ারের চামড়ার ওপরে।

মায়া দেবতা:

এদের ধর্ম বিশ্বাস ছিলো অত্যন্ত প্রবল। এতোটাই প্রবল ছিলো যে তাদেরকে ধর্মান্ধও বলা চলে। তারা বহু দেবতায় বিশ্বস্ত ছিল। চন্দ্র,সূর্য,বৃষ্টি,শস্য ইত্যাদি সবই ছিল তাদের উপাসনার অংশ।

মায়া সাম্রাজ্যর প্রধান অর্থাৎ রাজা বা “কুহুল আযা” পারিবারিক ভাবে নির্বাচন করা হতো। তারা দেবতা ও পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। ধর্ম পালন করতে গিয়ে সভ্যতার কোন এক সময় তারা হিংস্র জাতিতে পরিণত হয়েছিলেন। ধর্মীয় উৎসব গুলোতে ঈশ্বরকে রক্ত উৎসর্গ করার মাধ্যমে পালন করতেন। তারা মনে করতেন রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করে তার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠা যায়। বিশেষ ধর্মীয় উৎসবগুলোয় রাজা স্বয়ং রক্তদান করতেন। এসব উৎসবগুলো খুবই গোপনে পালন করা হতো।

তাদের মতে পৃথিবী চতুর্ভুজ আকৃতির ও সমতল ধরনের। আর এই চতুর্ভুজের চার কোণাকে চারজন শক্তিশালী “বাকাব” দেবতা ধরে রেখেছেন। চারটি কোণা লাল,কালো,সাদা, হলুদ এবং কেন্দ্র সবুজ রঙের।তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গ ১৩স্তর বিশিষ্ট আর নরক ৯স্তর বিশিষ্ট।

মায়ান দেবতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেবতারা হলেন চিয়াক,আহপুছ, কিনিস আহাউ,বি,এল। মৃত্যুর দেবতা “আহপুছ”, দেবতা “বি” জন্ম-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করেন।দেবতা “চিয়াক” হচ্ছেন উর্বরতার দেবতা, সূর্য দেবতা “কিনিস আহাউ” এবং “এল” হচ্ছেন নরকের দেবতা। তবে প্রধান দুই অমর দেবতা হলে ইতজামনা বা ইটজামনা ও কুকুলকান।

ইটজাম্না:

মায়াদের কাছে ইনিই ছিলেন সৃষ্টির দেবতা। মায়া পুরাণ অনুসারে তিনিই এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। তিনিই নাকি দিন এবং রাত্রির সৃষ্টি করেছেন। মায়ারা বিশ্বাস করত যে তিনি স্বর্গের দেবতা। তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, এই ইটজাম্নাই তাদে লিখতে ও দিনপঞ্জী তৈরি করতে শিখিয়েছেন। মায়ান ভাষায় ইটজাম্না শব্দের অর্থ টিকটিকির বাড়ি

কুকুল্কান:

কুকুলকান শব্দের অর্থ পালক দ্বারা আবৃত সাপ। শক্তিশালী দেবতা কুকুলকানের সাথে সনাতন ধর্মের দেবী মনসার মিল রয়েছে। মায়ান জাতির রাষ্ট্রধর্ম ছিল এই দেবতার উপাসনা করা। কথিত আছে দেবতা কুকুলকানের বাবা সাপদের রাজা। কুকুলকানের দৈহিক আকৃতি সম্পর্কে বলা থাকে ডানাওয়ালা সরীসৃপ।দেবতা কুকুলকানের উপাসনা করার জন্য নবম দশম শতকের মাঝামাঝিতে মায়ানরা তৈরি করেছিল ১০০ ফুট উচ্চতার একটি পিরামিডসদৃশ উপাসনালয়। চারদিকে ৯১টি করে সিঁড়ির ধাপ, আর একেবারে ওপরে উঠার জন্যে একটি ধাপ। সর্বমোট ৩৬৫টি ধাপ নিয়ে তৈরি হয়েছিলো এই উপাসনালয়টি।

বোলোন টজাখাব:

অনেকেই মনে করেন এর নাম থেকেই স্প্যানিশ বিকৃত উচ্চারণে তা হ্যারিকেনে পরিণত হয়েছে। কেননা ইনি ছিলেন একত্রে ঝড়ের, বজ্রপাতের এবং আগুনের দেবতা। তবে ইউকাটায়েন উপকূলে হ্যারিকেনের উৎপাত সবচেয়ে বেশী এবং এই দেবতার পুজাও তাই ঐ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী করা হত। মায়া ভাষায় হুরাকান বা বোলোন ট জাখাব শব্দের অর্থ একপদবিশিষ্ট দেবতা। মায়া পুরাণ অনুসারে যখন এই দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন তখনই নাকি তিনি বন্যা পাঠিয়ে মানুষকে উচিত শিক্ষা দেন।

চায়াখ:

তিনি বজ্রপাতের দেবতা। তিনি নাকি প্রথমে মেঘ তৈরি করেন, তারপর বজ্রপাত উৎপন্ন করেন।

ঐশ্বরিক সম্রাট: সম্রাট ছিলেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী। তিনি নাকি মানুষ ও দেবতার মধ্যে মধ্যস্থতা করেন, এরকমই মায়ারা ভাবত।

পুরোহিত:

মায়া সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হলেন এই পুরোহিত।
ঈশ্বরকে তুষ্ট রাখা।যথার্থ ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা।অলৌকিক বা ব্যাখ্যাতীত কার্যকলাপের অনুষ্ঠান করা।সূর্যগ্রহণের এবং চন্দ্রগ্রহণের তালিকা প্রস্তুত করা ভূমিকমপ, খরা, দুর্ভিক্ষ, প্লেগ এইসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আটকানো। যাতে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হয় সে জন্য চায়াখ দেবতাকে তুষ্ট করা।
পুরোহিতকূল যদি কোনও কারণে এর কোনও একটা কাজ ঠিকমতন করতে না পারতেন; তবে চাকরিটা খোয়াতে হত।

নরবলি :

এই উন্নত জাতি মূলত ঈশ্বরের তুষ্টি লাভের জন্য মানুষকে নরবলি দিতেন। আর এই নরবলি সম্পূর্ণ হতো অনেকটা অ্যাজটেক রীতি অনুসারে। নরবলির জন্য যেই ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হতো তার বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে দেবতাদের উদ্দেশ্য উৎসর্গ করা হতো। তারা বিশ্বাস করতেন পৃথিবীতে যেহেতু পাপীর সংখ্যা বেশি সেহেতু যাদেরকে বলি দেওয়া হয় শুধুমাত্র তারাই স্বর্গে যাবে।

মৃত্যু :

মায়ারা তীব্রভাবে মৃত্যু পরবর্তী জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা ভাবত যেহেতু বেশীর মানুষ পাপী তাই তাদের নরকে যেতে হয় যেখানে দুষ্ট দেবতা তাদের গিলে খেয়ে ফেলার জন্য তৈরি থাকেন। তাদের বিশ্বাস অনুসারে কেবলমাত্র যে মহিলা শিশুর জন্ম দেওয়ার পরেই মারা গিয়েছেন এবং যাকে নরবলি দেওয়া হয়েছে তারাই কেবল স্বর্গে যেতে পারবেন।

পিরামিড:

অধিকাংশ পিরামিড ছিল হয় কুকুল্কান নয়তো ইটজাম্নার প্রতি সমর্পিত। এইসব পিরামিডে সিঁড়ি বেয়ে কেবল উঠত পুরোহিতকূল। তারা বছরে কেবল পাঁচদিন বাদে বাকি সব দিনেই পিরামিডের চুড়ায় উঠত। সেখানে তারা নরবলি এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত। সাধারণ মানুষের সাথে এমনকি রাজারও সেখানে যাওয়া বারণ ছিল। কেবল যেসব দিন শুভ ছিল সেসব দিনে রাজা এবং অভিজাতরা পিরামিডে উঠতেন। সাধারণ মানুষের জন্য বছরে মাত্র একদিনই পিরামিডে ওঠার সৌভাগ্য হত। সেটা হল রাজার জন্মদিন উপলক্ষে!

স্থাপত্য :

মায়ানরা একটি মন্দিরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বড় গ্রাম গড়ে তুলত। বড় গ্রামগুলোর ঠিক মাঝখানে বড় শহর নির্মাণ করা হতো। মায়াসভ্যতা ছিলো মূলত নগর রাষ্ট্র। এই নগর রাষ্ট্র চলত প্রজাদের খাজনায়। মায়ান রীতি অনুযায়ী, নগরাষ্ট্র গুলোর একেবারে মাঝখানে সূর্য মন্দির বানানো হতো। মায়া সভ্যতার উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যগুলো হলো চিচেন ইটজা, নর্থ আ্যাক্রপলিস, টিকাল, গুয়াতেমালা এবং বলকোর্ট আ্যাট টিকাল, এল মিরাডর। টাইকাল, কোপায়েন, টেওটিহুয়াকান এবং চিচেন ইটজায় সূর্য মন্দিরের অসাধারণ নমুনা দেখা যায়। সূর্য মন্দিরগুলো ছিল অনেকটা পিরামিড আকৃতির। “চিচেন ইতজা” যাকে আবার “নরবলির শহর” নামেও অভিহিত করা হয় মূলত সেই শহরটি ছিল মায়া সভ্যতার অন্যতম এক শহর। এই শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো পিরামিড, মঠ, টেম্পল অব দি ওয়ারিয়র্স, কারাকোল বা গোল স্তম্ভ ইত্যাদি। শহরটি দুটো কুয়ার মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে উঠে।

ভবিষ্যৎবাণী:

তাদের দিনপঞ্জী ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত। তারা এমন কিছু দিনপঞ্জী তৈরি করেছিল যা ৫৪ কোটি বছরের অসাধারণ ত্রুটিহীন হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণীর কথা সবারই জানা। হ্যাঁ ২০১২ এর ২১শে ডিসেম্বরে পৃথিবী ধ্বংস হবার কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এটা মায়া ভাষা পড়তে না পারার মাসুল। তারা আদপেই পৃথিবী ধ্বংসের কথা বলে নি। তারা বলেছিল যে, এর পর পৃথিবীতে নতুন যুগ শুরু হবে। সেটাকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল দুনিয়া ধ্বংসের ভবিষ্যৎবাণী! তারা প্রত্যেক পৃথিবী হতে দ্রষ্টব্য তারার আবর্তন, আগত দিনক্ষণ এর হিসাব অতি নিখুঁত ভাবেই করেছিল। তারা মনে করত যে, বছরের বেশ কিছু দিন তাদের কাছে অপয়া এবং বছরের পাঁচ দিন অপয়া (এই পাঁচদিন + বাকি ৩৬০ দিন = ৩৬৫ দিন)। যে পাঁচদিন অপয়া ছিল সেদিন কোনও শুভকাজ তারা করত না, উপবাসে থাকত বাইরে যেত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.