জেনে নিন, মধুর যত গুণ

যদি আপনি সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিগুন বিবেচনা করে একটি খাদ্য তালিকা তৈরি করতে চান তাহলে সেই তালিকার প্রথম সারিতেই থাকবে মধু। হ্যা, মধু শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে, নিয়মিত মধু সেবন করলে একজন মানুষ অসংখ্য রোগব্যাধির থেকে পরিত্রাণ পাবেন। আজকের এই পোস্টে আমি আপনাদের মধুর উপকারিতা এবং গুণাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব। পোস্টটি শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল।

মধু লাখ লাখ মৌমাছির কষ্টের ফসল৷ মৌমাছিরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের রেণু ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করে তাদের পাকস্থলীতে জমা রাখে। তারপরে সেখানে মৌমাছির মুখের লালা মিশ্রিত হয়ে এক জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মধু তৈরি হয়। এরপরে সে মধু মৌমাছির মুখ থেকে মৌচাকে জমা করা হয়।

মধুর উপাদান 

মধুতে প্রায় ৪৫ রকমের খাদ্য উপাদান থাকে। ফুলের পরাগের মধুতে ২৫ থেকে ৩৭% গ্লুকোজ, ০.৫-৩.০% সুক্রোজ, ৩৪-৪৩% ফ্রুক্টোজ এবং ৫-১২% মন্টোজ থাকে। এছাড়াও আরো ২৮% খনিজ লবণ, ২২% অ্যামাইনো এসিড, ১১% এনকাইম থাকে। ১০০ গ্রাম মধুতে ২৮৮ ক্যালরি থাকে। এতে চর্বি এবং প্রোটিন নেই।

পবিত্র কোরআনে মধুর কথা 

মৌমাছিকে আরবি ভাষায় ‘নাহল’ বলা হয়৷ পবিত্র কোরআনে নাহল নামে এটি সূরাও রয়েছে। এই সূরা নাহলের ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

” তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। মধু হচ্ছে ঔষুধ এবং খাদ্য উভয়ই। মধুকে বলা হয়- বিররে এলাহি ও তিব্বে নব্বী। অর্থাৎ খোদায়ী চিকিৎসা ও নবী(সা.) এর বিধানের অন্তর্ভুক্ত। – সূরা নাহল, আয়াত ৬৯। 

এছাড়া পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 

“জান্নাতে স্বচ্ছ মধুর নহর প্রবাহিত হবে ” -সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ১৫। 

এলাকা ভেদে মধুর স্বাদ এবং রঙের ভিন্নতা দেখা যায়। যেসব অঞ্চলে ফুল-ফল এর প্রাচুর্য থাকে সেই এলাকার মধুতে তার স্বাধ এবং প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মধু তরল বলে একে পানীয় বলা হয়৷ মধু যেমন স্বাদে তৃপ্তিকর তেমনি রোগ ব্যাধির জন্য অত্যন্ত ভালো। কেন ভালো হবে না? এ মধু যে প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহর সৃষ্টি মৌমাছি তৈরি করছে। আল্লাহর নেয়ামত কখনো খারাপ হতে পারে না। মানুষের জন্য মধু আল্লাহর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। মধুর একটি মজার ব্যাপার আছে সেটি হলো মধু কখনো নিজে নষ্ট হয় না আবার অন্য বস্তুকেও নষ্ট হতে দেয় না। তাই সেই প্রাচীন যুগ থেকে বিজ্ঞানীরা একে অ্যালকোহলের স্থলে ব্যবহার করে৷ 

হজরত ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে হয়েছে যে, তার শরীরে ফোঁড়া বের হলেও তিনি মধুর প্রলেপ দিয়ে চিকিৎসা করতেন।  এর কারণ জিজ্ঞেসা করা হলে তিনি বলেন- আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কি বলেননি যে, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। – কুরতুবী 

হাদিসে মধুর গুণাগুণ

বিশ্ব নবী হজরত মুহাম্মদ(সা.) এর মতে সকল পানীয় উপাদানের মধ্যে মধু সর্বোৎকৃষ্ট। হজরত আব হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ” রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যাক্তি প্রত্যেক মাসে তিন দিন ভোরে মধু চেটে খায় তার কোন বড় বিপদ হতে পারে না” -(ইবনে মাজাহ, বয়হাকী)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – আল্লাহর শপথ যে ঘরে মধু আছে অবশ্যই ফেরেস্তারা সে ঘরের অধিবাসীদের মাগফেরাত কামনা করে। কোন ব্যাক্তি যদি মধু পান করে তবে যেন তার পেটে লক্ষ রোগের ঔষুধ স্থির হলো এবং পেট হতে লাখ রোগ বেরিয়ে এলো। আর যদি সে পেটে মধু ধারণ অবস্থায় মারা যায় তবে তাকে দোজকের আগুন স্পর্শ করে না। -নেয়ামুল কোরআন 

হাদিসে আরো বর্ণিত আছে হুজুর পাক (সা.) বলেছেন, তোমরা দুটি সেফা দানকারী বস্তুকে নিজেদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় করে নাও। একটি মধু অপরি কুরআন।- (মিশকাত)

উপরোক্ত আলোচনা পড়ে আপনি হয়ত এতক্ষণে বুঝতেই পেরেছেন ইসলামে মধুর উপকারিতা কত খানি এমনকি আমাদের নবিও মধু খাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন এবং তিনিও মধু পছন্দ করতেন। 

মধুর উপকারিতা 

হজমে সহায়তাঃ- মধুতে যে শর্করা থাকে সেটি খুব সহজেই হজম হয়। কারন এতে যে ডেক্সটিন থাকে, সেটি সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিক ক্রিয়া করে। পেটরোগা মানুষের জন্য মধু খুব উপকারী। 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করনে:- মধুতে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়রিয়া দূরীকরণে সহায়তা করে। যদি কেউ ১ চামচ খাঁটি মধু রোজ ভোর বেলা পান করে তাহলে তার কোষ্ঠবদ্ধতা এবং অম্লত্ব দূর হবে। 

ফুসফুসের রোগ এবং শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে:- ফুসফুসের রোগের জন্য মধু খুবই উপকারী। যদি শ্বাসকষ্ট রোগীর নাকের কাছে মধু ধরে শ্বাস টেনে নেওয়া হয় তাহলে সে আরো স্বাভাবিক এবঙ গভীরভাবে শ্বাস নিতে পারবে। অনেকের মতে এক বছর পুরাতন মধু শ্বাসকষ্ট রোগীর জন্য বেশ ভালো। 

রক্তশূন্যতা দূরীকরণে :- রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে মধু সাহায্য করে বলে রক্তশূন্যতা রোগীর জন্য এটি বেশ ফলদায়ক। কারন মধুতে অধিক পরিমাণে লৌহ, কপার, ম্যাঙ্গানিজ থাকে।

অনিদ্রা:- মধু অনিদ্রার একটি উপকারী ঔষধ। রাতের বেলা ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানির সঙ্গে দুই চামচ মধু মিশিয়ে খেলে ভালো ঘুম হয়।

পাকস্থলীর সুস্থতায়:- মধু দ্রুত খাদ্য হজমে সহায়তা করে এবং পাকস্থলীর কাজকে জোরালো করে। মধু হাইড্রোক্রলিক অ্যাসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয় বলে বুকজ্বালা, অরুচি, বমিভাব এগুলো দূর করা সম্ভব হয়। 

পানিশূন্যতায়:- শরীরে ডায়রিয়া কিংবা পানিশূন্যতা দেখা দিলে এক লিটার পানিতে ৫০ মি.লি মধু মিশিয়ে খেলে দেহের পানি শূন্যতা রোধ করা যায়। 

যৌন দুর্বলতায়:- যেসব পুরুষদের যৌন দুর্বলতা আছে তাদের জন্য প্রতিদিন মধু এবং ছোলা মিশিয়ে খাওয়া অনেক উপকারী। 

মুখগহ্বর সুস্থ রাখতে:- মধু দাঁতের উপর ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষয়রোধ হয়৷ মধু দাঁত পড়ে যাওয়া এবং দাঁতে পাথর জমাট বাঁধা রোধ করে। মুখের কোন ঘায়ের জন্য গর্ত হলে সে গর্ত ভরাট করতে সাহায্য করে মধু এবং পুঁজ জমতে বাঁধা দেয়।

তাপ উৎপাদনে:- এক-দুই চামচ মধু এক কাপ ফুটানো পানির সাথে মিশিয়ে খেলে শরীর তাজা এবং ঝরঝরে থাকে। শীতের সময় মধু শরীরকে গরম রাখতে সাহায্য করে। 

দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে:- চোখের জন্য মধু খুবই উপকারী জিনিস। অনেকের মতে গাজরের রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়।

ওজন কমাতে:- মধুতে কোন চর্বি নেই। এটি পেট পরিষ্কার করে এবং চর্বি কমাতে সাহায্য করে যার ফলে ওজন কমে।

তারুণ্য বজায় রাখতে:- তারুন্য বজায় রাখতে মধুর ভূমিকা অনেক। এটি একটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ত্বকের রং এবং ত্বককে সুন্দর করে।ত্বক বুড়িয়ে যাওয়া ও ভাঁজ পড়া রোধ করে। শরীরের তারুণ্য এবং সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করে।

রক্ত পরিষ্কারক:- একটি গ্লাসে গরম পানি নিয়ে তার মধ্যে এক চামচ লেবুর রস এবং দুই চামচ মধু মেশান। প্রতিদিন পেট খালি করার আগে এই মিশ্রণ খান। এটি রক্ত এবং রক্তনালি পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। 

রোগ প্রতিরোধ শক্তি:- মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে এবং শরীরের ভিতরে ও বাইরে নানা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে৷ মধুতে থাকা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী উপাদান অনাকাঙ্ক্ষিত সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে। 

উচ্চ রক্তচাপ কমায়:- এক চামচ রসুনের রসের সঙ্গে দুই চামচ মধু মেশান। সকালে এবং সন্ধ্যায় দুইবার এই মিশ্রণটি খান৷ প্রতিদিন এই মিশ্রণটি খেলে উচ্চ রক্তচাপ কমবে। সকালে খাওয়ার এক ঘন্টা আগে মিশ্রণটি খাওয়া উচিত। 

শেষ কথা

আজকের এই পোস্টে মধুর উপকারিতা এবং স্বাস্থ্য গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা করেছি। পোস্টে ব্যবহার হওয়া সকল তথ্য নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা, যদি কেউ কোন তথ্য ভুল মনে করে থাকেন তাহলে সঠিক তথ্যটি কমেন্ট করে জানাবেন এবং ভুলটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। 

Leave a Comment